প্রথম প্রকাশিত সচলায়তন-এ (১৫ মে ২০০৯)
খবরটা পড়ার পর থেকেই বারবার জর্জ বার্নাডশ’ ও জনৈক সুন্দরী নায়িকার গল্পটা মনে পড়ছে! পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, আমাদের আগামী বাজেট হবে সরকারী ও বেসরকারী অংশীদারিত্বের (পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ বা পিপিপি) বাজেট। অর্থাত্ আগামী বছর থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের সাথে বেসরকারী বিনিয়োগও যুক্ত হবে।
কিন্তু বার্নাডশ’র গল্পের সাথে এর সর্ম্পক কী? বলছি। তবে গল্প বলার আগে শানেনযুলটা দিয়ে নিই।
হলিউডের পরিচালক জোসেফ লেভিন বলতেন- সিনেমার প্রচার যদি ঠিক থাকে আর বাজেটের আকার যদি অনেক বড় হয়, তাহলে দর্শকদের বোকা বানিয়ে হলে আনা সহজ। প্রতিবছর মে-জুন এলেই আমাদের দেশের সরকারগুলো হলিউডি সিনেমার মতই সরকারি বাজেটের আকার আর গুনাগুণ নিয়ে প্রচারনা শুরু করে দেয়। তাই সিনেমা হলে যাবার আগে রিভিউ আর ট্রেলর দেখার মতনই, বাজেট আসার আগে একটা প্রাক-বাজেট ধারনা নেবার জন্য এই লেখাটা লেখা।
বাজেটে সরকারী ও বেসরকারী অংশীদারিত্ব বা পিপিপি কোন নতুন বিষয় না। একটি হাসপাতালে কথাই ভাবুন যেটি বেসরকারী ক্লিনিকের মতন ঝকঝকে, কিন্তু সরকারী হাসপাতালের মতন সুলভ; ডাক্তার-নার্স বেসরকারী ক্লিনিকের মতন চটপটে, কিন্তু আপনি তাদের উপর সরকারী হাসপাতালের মতনই ভরসা করতে পারেন। এটা সহজেই সম্ভব যদি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা আর আইনি কাঠামোর মধ্য বেসরকারী মূলধনে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা যায়। বেসরকারী খাত এর ব্যবস্থাপনা দেখবে, কিন্তু প্রকৃত সেবাদান থাকবে সরকারী হাতে। প্রয়োজনে সরকার একটি থোক বরাদ্দও দিবে যেন স্বল্প মূল্যের সেবাদান করেও প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক থাকে। আয়ের একটি অংশ দিয়েই বেসরকারী বিনিয়োগের লভ্যাংশ মেটানো হবে।
আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, সিঙ্গাপুর এমনকি পার্শবর্তী ভারতেও এটা চালু আছে অনেক দিন ধরে। সরকারের সীমিত আয় যখন ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখনই এই বেসরকারী মূলধন আকৃষ্ট করার চল শুরু হয়। মূলত: বিগত দুই দশেকই এর প্রকৃত বিস্তার ঘটেছে। তবে বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলা নয়, বরং সরকারী ও বেসরকারী খাতের ভালো গুনগুলোকে একত্র করে জনগনকে সর্বত্তম সেবা দেয়াটাই পিপিপি এর প্রাথমিক উদ্দেশ্যে পরিনত হয়েছে। উদ্দেশ্য- সেবাদানে সরকারী সীমাবদ্ধতা যেমন- অর্থাভাব, দূর্ণীতি, অব্যাবস্থা; এবং বেসরকারী সীমাবদ্ধতা যেমন- অনির্ভরতা, লাগামহীন মুনাফা প্রবনতা, দুটোই দুর করা।
কিন্তু যদি উল্টোটা হয়? এখানেই বার্নাডশ’ গল্পটা মনে পরে যাচ্ছে।
এক অনুষ্ঠানে বার্নাডশ’র সাথে জনৈক সুন্দরী নায়িকার দেখা।
নায়িকা: আমাদের দুজনের উচিত একটি সন্তান নেয়া। একবার ভাবুনতো সন্তানটি যদি আপনার বুদ্ধি আর আমার রূপ নিয়ে জন্মায়, তাহলে তা কি অসাধারন হবে!
বার্নাডশ’: কিন্তু সন্তানটি যদি আপনার বুদ্ধি আর আমার রূপ নিয়ে জন্মায় তাহলে কী হবে এটা ভেবে দেখেছেন?
বাজেটে সরকারী ও বেসরকারী অংশীদারিত্বের খবরটা পড়ার পর থেকেই কেন যেন এই গল্পটা মাথায় ঘুরছে। যদি সরকারী ও বেসরকারী খাতের ভালো গুনগুলো একত্র না হয়ে সব বদ গুনগুলো একত্র হয়, তখন কী হবে?
বাংলাদেশের বেসরকারীকরনের পূর্বাভিজ্ঞতা এমনিতেই খুব খারাপ। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৭- এই বিশ বছরে বেসরকারীকরনকৃত ২০৫ টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর চালানো এক জরীপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশের বেশী প্রতিষ্ঠানই ইতমধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং প্রায় ৫ শতাশং প্রতিষ্ঠানের কোন হদিসই পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই দূর্ণীতির মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করা হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে এর বেসরকারী মালিকেরা দ্রুত মুনাফার লোভে জমি-যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়েছে।
পিপিপি যেহেতু একটি চলমান দ্বি-পাক্ষিক বিষয়, হয়তো বেসরকারীকরনের ভাগ্য এটি বরণ করবে না। কিন্তু শুরু থেকেই যদি এর ব্যবসায়িক ঝুকির বন্টন এবং পরিচালনার আইনি কাঠামো ঠিক করা না হয়, এবং সরকারের সাথে বেসরকারী বিনিয়োগকারীর চুক্তি যদি পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে সম্পাদন করা না হয়, তাহলে এটি বেসরকারীকরনের চেয়েও খারাপ পরিনতি তৈরী করতে পারে। দূর্ণীতির মাধ্যমে বেসরকারী বিনিয়োগকারীকে বাড়তি সুবিধা দেয়া তো আর আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নতুন কিছু নয়!
পিপিপি ধারনাটি আসলে ছুরির মতন- যা দিয়ে রোগীকে সারিয়ে তোলা যায়, আবার খুন করাও যায়। সরকারী ও বেসরকারী খাতের ভালো গুনগুলো একত্র করা গেলে দেশের জন্য তা হবে ২+২=৪. আর দুই খাতের খারাপ গুনগুলো যদি একত্র হয় তাহলে ২+২= মাইনাস ৪!
যেহেতু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক আর বিদ্যুত অবকাঠামোর মতন স্পর্শকাতর খাত এটিতে অর্ন্তভুক্ত হচ্ছে, তাই শুরু থেকেই এর চুক্তিসমুহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সরকার, গনমাধ্যম এবং জনগন সকলকেই অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে।
উন্নয়নে সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্ব এখন আর এড়িয়ে চলার অবস্থায় নেই। একদিকে ইলেক্ট্রিসিটির ভয়াবহ অবস্থা, অথচ অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও তেমন ভাবে বড়ছে না (সরকারী প্রকল্পের ঢিলেমির কথা না হয় নাই বললাম)। সঙ্গত কারনেই বেসরকারী খাতের দ্বারস্থ হওয়া। কিন্তু জনসেবার মতন খাত গুলোকে পুরোপুরি মুনাফা-প্রবণ ওই বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়াও কাজের কথা নয়। যে কারনে এই “খিচুড়ি-প্রকল্প”-এর আগমন।
এটাতো ঠিক যে ব্যবসয়ী তার মুনাফার জন্যই বিনিয়োগ করবে, দান করার জন্য নয়। তাছাড়া লাভজনক না হলে তো প্রকল্পটিও সচল থাকবে না। আসলে মুনাফা আমাদের দেশের জন্য সমস্যা নয়। হাস যদি সোনার ডিম পাড়ে তো খুবই ভালো কথা। সমস্যা হলো- অতিলোভে যখন “সোনার ডিমপাড়া হাসটিকে” কেটে ফেলা হয় (যেমনটি হয়েছে বেসরকারীকরণ এর ক্ষেত্রে)।
সমাধান? অন্যদেশগুলো যা করেছে তাই করা- আইন আর ব্যবস্খাপনার কাঠামো আগে থেকে ঠিক করা। চুক্তিতে স্পস্ট উল্লেখ রাখা- কী শর্তে বিনিয়োগ হচ্ছে, প্রকল্প সফল না হলে সরকারী ও বেসরকারী খাত এর মাঝে কিভাবে দায় বণ্টন হবে (যেন সরকারের উপর পুরো দায় না বর্তায়), কিভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে, ইত্যাদি। সরকারের হাতে সময় নেই– আসছে অর্থবছরেই যদি এটি করতে হয়, তাহলে অনেক কাজ বাকী। আর প্রথম কাজ, এমন আইনি সিস্টেম করা যেন দূর্ণীতির সুযোগই না থাকে।