এই আয়েশা, সেই আয়েশা এবং একটি শরীয়া আইন

সচলায়তনে প্রকাশিত (১২.১২.২০০৯)

মাটির গর্তে বুক পর্যন্ত দাড়িয়ে থাকা ছোট্ট পাপী মেয়েটি ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে চলছিল “আমি আর বলবো না… আমি আর বলবো না… আমাকে মাফ করে দাও … আমি আর বলবো না…” সমাজকে নিষ্কলুষ আর পাপমুক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর ধর্মপতিদের হাত থেকে তখন অবিরাম ছুটে আসছে পাথর… ছোট পাথর, বড় পাথর, গোল পাথর, এবড়ো-থেবড়ো পাথর… পাথরগুলো ছুটে যাচ্ছে মেয়েটার চোখ-মুখ-মাথা লক্ষ্য করে। একটা-দুটো বেয়াড়া পাথর অবশ্য টার্গেট মিস করছে, তাতে ছোট্ট পাপী মেয়েটির মরণক্ষণ সামান্য দীর্ঘায়িত হচ্ছে মাত্র। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে ধর্মরক্ষকদের। তাদেরকে আবার নিচু হয়ে নতুন পাথর তুলে মেয়েটার মুখ নিশানা করে সবেগে ছুড়ে মারতে হচ্ছে! কী যন্ত্রনা! মাত্র তের বছরের একটা মেয়ের মরতে এতো সময় লাগবে কেন?

আলজাজিরার খবর অনুযায়ী সোমালিয়াবাসি মেয়েটার নাম আয়েশা। পুরো নাম আয়েশা ইব্রাহীম দুহুলো। ধরেই নেয়া যায় মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া মেয়েটির নাম রাখা হয়েছিল আল্লাহর নবীর প্রিয়তম স্ত্রী আয়েশা (রা) এর নাম অনুসরণে। একদিন এই সোমালিয়াবাসি আয়েশা হেটে হেটে যাচ্ছিল মোগাদিসু নামক স্থানে তার দাদী বা নানীর বাসায় । পথিমধ্যে তিনজন লোক তাকে জোরপূর্বক … ওই ঘটনায় মেয়েটি স্বর্বস্ব: হারিয়েছিল এটা বলা ভুল হবে। কারন ওই ঘটনায় মেয়েটি জীবনাটাতো আর হারায়নি। মেয়েটি আসলে স্বর্বস্ব: হারিয়েছে যখন সে এই ঘটনার নালিশ জানাতে গিয়েছে কর্তৃপক্ষের কাছে।

কর্তৃপক্ষেরই বা আর কী দোষ? তারা তো আইনের হাতে বন্দী। মেয়েটা যেহেতু নিজেই স্বীকার করেছে, তার মানে এই অন্যায় কাজটা অবশ্যই ঘটেছে। এখন দায়ী ব্যক্তিকে বের করে শাস্তি দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু দায়ীটা কে? ঐ লোকগুলোই দায়ী না-কী মেয়েটিই আসলে ঐ লোক তিনটাকে প্রলুব্ধ করেছিল? শরিয়া আইনে এটা বের করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে, কাজেই এটা প্রমান করা কোন সমস্যাই হলো না যে মেয়েটিই আসলে দায়ী। তো কী আর করা?

সমাজকে পাপমুক্ত রাখতে শেষ পযর্ন্ত কিসমায়ু শহরে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনসম্মুখে পাথর ছুড়ে মেরেই ফেলতে হলো মেয়েটিকে!

শরিয়া আইন:

মেয়েটা যেহেতু ইতোমধ্যেই মরে বেচে গিয়েছে, আসুন আমরা দ্রুত শুধু একবার জেনে নেই ঠিক কীভাবে তার দুশ্চরিত্র উৎঘাটন করা হয়েছিল। এরপর আপনাদের আরেকটি গল্প বলবো। কথা দিচ্ছি পরের গল্পটা মিলনাত্নক হবে, এমন বিয়োগান্তক নয়। ইসলামে অবৈধ সম্পর্কের বিচার আর পাথর ছুড়ে মৃত্যুদন্ড নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। কোরানের কোন আয়াতে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদন্ডের কোন বিধান নেই, যদিও অনেকেই দাবী করে থাকেন যে কোরানে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদন্ডের উপর হারিয়ে যাওয়া অথবা বাতিলকৃত একটি আয়াত বা সুরা ছিল। মূলত: সহি বুখারী আর সহি মুসলিমের কিছু হাদিস থেকেই এই বিতর্কের উদ্ভব। ইচ্ছে হলে এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু পাথর, রশি, বিদ্যুৎ না-কি ইঞ্জেকশন কোনটা কী কারনে মৃত্যুদন্ডের জন্য ভালো এই বিতর্ক এখানে জরুরী নয় (আমার ভালোও লাগে না)। আমাদের জানা প্রয়োজন কিভাবে শরিয়া আইন আয়েশাকে দুশ্চরিত্রা প্রমান করলো। শরিয়া আইনে অবৈধ শারীরক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ প্রমাণের উপায় বলে দেয়া আছে। পাকিস্তানে ইসলামী আইন সমন্বিতকরণের জন্য ১৯৭৯ সনে যে অধ্যাদেশ জারী করা হয়েছিল তাতে শরিয়া আইনের এই ধারাটি উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে-

“Proof of zina liable to hadd shall be in one of the following forms, namely:- (a) the accused makes before a Court of competent jurisdiction a confession of the commission of the offence; or (b) at least four Muslim adult male witnesses… give evidence as eye-witnesses of the act of penetration necessary to the offence: Provided that, if the accused is a non-Muslim, the eye-witnesses may be non-Muslims.”

(Article 8 of The Offence of Zina (Enforcement Of Hudood) Ordinance, 1979, Ordinance No. VII of 1979)

ধারা ৮(ক) অনুযায়ী আয়েশা স্বীকার করেছে যে তার সাথে অন্য তিনজন ব্যক্তির অবৈধ এবং জোরপূর্বক সম্পর্ক হয়েছে। কিন্তু ধারা (খ) অনুযায়ী আয়েশা চারজন পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শী উপস্থিত করতে পারেনি যারা প্রমান করবে যে এটা তার অমতে ঘটেছে এবং দায়ী আসলে ঐ তিন ধর্ষক। তাহলে কী প্রমান হলো? আশেয়ার অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে (স্বীকৃত), কিন্তু অন্য কেউ দায়ী নয় (যেহেতু অপ্রমাণিত)।

অতএব আয়েশা নিজেই দায়ী। জেনা-র শাস্তি পাথর ছুড়ে মৃত্যুদন্ড!

আরেকটি গল্প

ষষ্ঠ হিজরীতে নবী (সা) মুরায়সী যুদ্ধে যাবার সময় স্ত্রী আয়েশা (রা)-কে সাথে নেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে এক স্থানে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিল। এমন সময় আয়েশা (রা) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে একটু দুরে কোথাও গিয়ে তার গলার প্রিয় হারটি হারিয়ে ফেলেন। উল্লেখ আছে, তিনি আগেও একবার এই হারটি হারিয়েছিলেন এবং নবী তখন লোক দিয়ে তা খুজে বের করার ব্যবস্থা করেছিলেন। কাজেই এইবার হারটি হারিয়ে আয়েশা আর নবীকে বিরক্ত করতে চাইলেন না। তিনি নিজেই সময় নিয়ে তা খুজতে লাগলেন। কিন্তু অবশেষে যখন তিনি কাফেলার কাছে ফিরে এলেন, তখন দেখলেন তাকে রেখেই সবাই চলে গিয়েছে!

আয়েশা ভ্রমন করতেন চাদর ঘেরা একটি আসনে, যা উটের পিঠে উঠিয়ে বহন করা হতো। যেহেতু তিনি স্বল্পবয়স্কা এবং ক্ষীণকায় ছিলেন, চাদর ঘেরা আসনে তার অনুপস্থিতি সম্ভবত: বাহকেরা টেরই পাননি। যাই হোক, ভগ্ন মনে আয়েশা ঐখানেই বসে রইলেন, যদি টের পেয়ে নবী তাকে উদ্ধারে আসেন এই আশায়। একসময় ওখানেই তিনি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

এদিকে যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় সাফওয়ান নামক এক সাহাবীকে নবীর কাফেলার পেছনে পেছনে আসার দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। যদি যুদ্ধ ফেরত কাফেলা পথিমধ্যে কিছু ফেলে যায়, তা কুড়িয়ে আনার জন্য। এই সাফওয়ানই ফেরার পথে দেখতে পান আয়েশা একা পথের ধারে ঘুমিয়ে আছেন। তখন তিনি নিজের উটের পিঠে করে আয়েশাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। কিন্তু রাতের বেলা কাফেলা ছেড়ে আয়েশার বর্হিগমন এবং পরবর্তীতে সাফওয়ানের সাথে তার একা ফিরে আসা মদীনায় যথেষ্ট কানাঘুষার জন্ম দেয়। নবীর অনেক অনুসারীও এই গুজবে অংশ নেন। এটা নিয়ে নবী ও আয়েশা ব্যপক অস্বস্তি ও দূর্ভাবনায় পরে যান।

ঠিক এমন সময় কোরআনের সূরা আন-নুর এর চতুর্থ আয়াত নাযিল হয়, যার অনুবাদ এরকম-

“এবং যারা সতী রমনীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না [তাদের অভিযোগকে সমর্থন করার জন্য], তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং এরপর থেকে কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। কারণ এরূপ ব্যক্তিরা দুষ্ট এবং সীমালংঘনকারী” (কোরআন ২৪:৪)

এরপর গুজব প্রচারকারীদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়া হলো। শুধু তাই না, এই আয়াত অনুসারে এমন ব্যবস্থা করা হলো যেন প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য ব্যতীত নারীদের প্রতি কেউ আর অপবাদ দিতে না পারে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! অনেক অনেক বছর পর এই আয়াতটিই একটি শরিয়া আইন তৈরীর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে! আর যাকে অপবাদ দিয়ে হত্যার জন্য এই শরিয়া আইন ব্যবহার করা হবে, তার নামও হবে আয়েশা। সম্ভবত দুজনের বয়সও প্রায় কাছাকাছি।

শেষ কথা:

এই আয়াত নিয়ে মাওলানা আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলীর তাফসীর অনুসরনে অধ্যাপিকা হোসনে আরা খান লিখেছেন

“সাধারণ যে কোনও ঘটনায় বা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন কি খুনের ব্যাপারে প্রমাণের জন্য দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্যদানকে যথেষ্ট ধরা হয়।… মিথ্যা সাক্ষী চারজন সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সে কারণেই চার জন সাক্ষীর উল্লেখ করা হয়েছে। … অসহায় স্বাধ্বী মহিলাদের মিথ্যা কলঙ্ক থেকে রক্ষা করার এ এক যুগান্তকারী দলিল”।

কোরানের ব্যাখ্যা দেবার মতন জ্ঞান আমার নেই। কিন্তু যে আয়াত সুনির্দিষ্টভাবে মেয়েদেরকে নিয়ে কুৎসা রটনাকারীদের বিরুদ্ধে নাযিল করা হলো, সেটা কিভাবে শরিয়ার অপব্যাখ্যার মাধ্যমে একটা মেয়ের উপরেই তার ধর্ষিত হবার চাক্ষুষ প্রমাণ দাখিলের দায় চাপিয়ে দিল, এটা আমার মাথায় ঢুকে না! শেষ সময়ে ওই অত্তটুকুন মেয়েটার ছোট্ট মনে কী ভাবনা ছিল তা ভাবতে গেলে আমার গা শিউরে উঠে।

মাঝে মাঝে দু:স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। মনে হয় দূর থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি ছোট্ট একটি মেয়ের আকুতি-

:আমি আর বলবো না… আমি আর বলবো না… আমাকে মাফ করে দাও … আমি আর বলবো না…

[সচলায়তনে বেশ কিছু বিশ্লেষণধর্মী মন্তব্য আছে শরিয়া নিয়ে, দেখুন এখানে]

Advertisements

Comments are closed.

%d bloggers like this: