খোমাতলীয় রঙ-বেরঙ

সচলায়তনে প্রকাশিত

১.
খোমাখাতার স্ট্যাটাসের মাথামুন্ডু প্রায়ই আমি বুঝি না। অনেকে সুন্দর সুন্দর বর্নছবি ব্যবহার করেন, যেমন-
মানুষের মুখ ٩(-̮̮̃-̃)۶ ٩(●̮̮̃•̃)۶ ٩(͡๏̯͡๏)۶ ٩(-̮̮̃•̃)۶ …
অথবা ছবি… _̴ı̴̴̡̡̡ ̡͌l̡̡̡ ̡͌l̡*̡̡ ̴̡ı̴̴̡ ̡̡͡|̲̲̲͡͡͡ ̲▫̲͡ ̲̲̲͡͡π̲̲͡͡ ̲̲͡▫̲̲͡͡ ̲|̡̡̡ ̡ ̴̡ı̴̡̡ ̡͌l̡̡̡ …দেখতে বেশ লাগে।

আবার যখন দেখি কেউ একান্ত আলাপচারিতা বা অন্যকে শুভেচ্ছা জানাতে দেয়ালের বদলে নিজের স্ট্যাটাস ব্যবহার করছে, তখন বিরক্ত লাগে। মাঝে মাঝে অবশ্য খোমাতলীয় (খোমাখাতায় কাকতলীয়) ব্যপারও ঘটে, দেখা যায় একাধিক বন্ধু যারা একে অপরকে চেনেই না, তারা সবাই প্রায় কাছাকাছি বিষয়ের উপরই স্ট্যাটাস দিয়ে রেখেছে।

তাই এই শনিবার যখন বেশ কিছু বন্ধুর স্ট্যাটাসে নানা রকম রঙের নাম লেখা দেখলাম, খুব একটা অবাক হলাম না। প্রথমে অবশ্য খেয়ালই করিনি যে এই রঙীন স্ট্যাটাসধারীরা সবাই নারী। কেউ কালো, কেউ লাল, অনেকেই হালকা বাদামী (Beige)। কেউ কেউ আবার দু-একটা লাইনও লিখে রেখেছে যা থেকেও কিছু বোঝার উপায় নেই কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে। যাই হোক, দেখলাম আবার ভুলেও গেলাম।

ঘটনা বুঝলাম পরদিন যখন খবরটা গুগল নিউজে আসলো। স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির এ হলো এক অভিনব প্রচারাভিযান। যখন এটা রঙ না-কি wrong এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল তখন বুঝলাম ইতোমধ্যে আরো অনেকেই এটা জেনে গিয়েছেন। অনেককেই দেখলাম প্রতিবাদ জানাচ্ছেন- কেউ তীব্রভাবে, কেউ মৃদুভাবে। কেউ সহমত প্রকাশ করছেন, আবার কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের স্ট্যাটাস দেখে বিব্রতও হচ্ছেন। কেউ আবার নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিষয়টির ভালো-মন্দ ব্যাখ্যা করছেন।

একজনের গঠনমূলক প্রশ্ন ছিল এমন (অনুবাদ)-

“যে দেশে ইজ্জত রক্ষার জন্য মেয়েদের ওড়না পরতে হয়, কর্মজীবি মেয়েরা সমস্যা এড়াতে ঘোমটা দেয়, এবং শেষ পর্যন্ত কাউকে কাউকে হিজাবও পড়তে হয় রাস্তার লাঞ্ছনা থেকে বাচার জন্য, সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ফেসবুকে ‘বক্ষবন্ধনীর রঙ’ স্ট্যাটাস হিসেবে দেয়াটা কি স্তন ক্যান্সারের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করবে, না-কি অসুস্থ্য কামানন্দ বিতরন করবে?”

অনেকেই একটি সংস্কারপন্থী মুসলিম রাষ্ট্রে এর প্রকৃত কার্যকারীতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ এটাকে আবার নিছক আনন্দের খোরাক হিসেবেও নিয়েছেন। অনেকে এই আলোচনাকে অশোভন বা অশ্লীল বলে এড়িয়ে গিয়েছেন।

কে এই স্ট্যাটাসের জন্ম দিয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে মাত্র পাচ মিনিটের গুগলানুসন্ধান আমাকে জানিয়ে দিল যে এর ভালো-মন্দ নিয়ে যেমন বিতর্ক হচ্ছে, তেমনি এর প্রচার-প্রসারের অবাক করার মতন ব্যাপ্তী আর দ্রুততা নিয়েও আলোচনা চলছে বিশ্ব ব্যাপী। এই ভাবে চলতে থাকলে দেখা যাবে জানুয়ারির ২ তারিখ একটা বিশেষ দিনের মর্যাদাও পেয়ে গিয়েছে।

২.
আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশে যখন জন্মনিয়ন্ত্রন প্রচারাভিযান শুরু হয়, তখন এর সাফল্য নিয়ে ব্যপক সন্দেহ ছিল। তত্ত্ব মতে, মধ্য আয়ের দেশে পরিনত না হওয়া পযর্ন্ত জন্মহার কমানো সম্ভব নয়। কারন একটি মধ্য আয়ের পরিবারের কাছে অধিক সন্তান মানে অধিক ব্যয়। কিন্তু নিন্ম আয়ের পরিবারে যেখানে সন্তান পালনের ব্যয় অত্যন্ত নগণ্য, সেখানে অধিক সন্তান বরং ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য বাড়তি হাত। তদুপরি বাংলাদেশ একটি সংস্কারপন্থী (এবং এরশাদ চাচুর কল্যাণে মুসলিম রাষ্ট্র) হিসেবেই পরিচিত ছিল। সেই দেশে কনডমের ব্যবহার নিয়ে প্রচারাভিযান?

অথচ যে দেশে এসব নিয়ে কথা বলা ছিল রীতি-নীতি-সংস্কারের বাইরে, সেই দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে সম্ভব হয়েছে ছেলে-বুড়ো-নারী-পুরুষের একত্রে বসে জন্মনিয়ন্ত্রনের উপর আলোচনা শোনা আর ভিডিও দেখা। আড়াই দশক আগে গ্রামের লোক কনডম কী জিনিস তাই বুঝতো না, অথচ চার বছর আগে বাংলাদেশেই এক বিলিয়ন রাজা কনডম বিক্রর সাফল্য উদযাপিত হয়েছে। মধ্য আয়ের দেশ হবার আগেই, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবার আগেই এদেশ তার জন্মহার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। মনে আছে স্কুলে রচনা পড়ার সময় নিন্ম আয়ের দেশে ‘বিনোদনের অভাবে জন্মহার বৃদ্ধি হয়’ কেন তার কোন সদুত্তোর পাইনি কারো কাছে। কিন্তু এখন এই বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রনের সাফল্যের কথাই বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে পড়ানো হয়। এটা যে কত বড় একটা সামাজিক উত্তরণ তা আসলেই অনির্বচনীয় (দেখুন এখানে)!

৩.
বাংলাদেশে সম্প্রতি এইডস বিষয়ে ব্যপক প্রচারনা শুরু হয়েছে। শুধু আফ্রিকা নয়, উন্নত দেশগুলিও এইডস মোকাবেলায় কঠিনতম যে প্রতিবন্ধকতার সম্মখীন হয়েছে তার নাম- সঙ্কোচ। শুধু এইডস নয়, কার্ভিক্যাল ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সারের মতন বিষয়গুলির প্রধান শত্রুও এই সঙ্কোচ।
এই সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলার সাফল্য আমাদের চেয়ে কে কবে বেশি দেখিয়েছে?

কিছু প্রশ্ন অবশ্য ঘোরাফেরা করছে। এই যেমন-

– এক দিনের ফেসবুক স্ট্যাটাস কী পৃথিবী থেকে ব্রেস্ট ক্যান্সার দূর করে দিয়েছে?
– না। কিন্তু একটা দিনের জন্য হলেও তো এটা মানুষকে ভাবিয়েছে। এটার প্রতিত্তোরে ম্যামোগ্রাম বা নিয়োমিত চেকআপ নিয়ে যে আলোচনাগুলো হয়েছে তাই বা কম কী? (এক বন্ধুকে দেখালাম একটা মজার ভিডিও পোস্ট করতে, দেখুন এখানে)

– কিছু লোক কি এর মধ্যে আনন্দ নেবার চেষ্টা করবে না?
– জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রচারণায় এরা আরো বেশি আনন্দ নিয়েছে। পরিধানের রঙ জানা যে ভাগ্যাহত লোকের একমাত্র আনন্দ, তার জন্য করুণা। সবাই সচেতন হলে এরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে।

– কিন্তু কারো কারো স্ট্যাটাস তো আর রঙে সীমাবদ্ধ থাকেনি… কিছু ক্ষেত্রে ভব্যতার সীমা ছাড়িয়েছে?
– তাদের ভ্রক্ষেপ না করলেই হয়। সব কাজেই তো কিছু ‘নাপতা’ থাকে। তারা হয়তো জানে না, বিষয়টা আসলে রঙ প্রকাশের বা ছবি প্রকাশের না, বিষয়টা পরীক্ষা করার (দেখনু এখানে)।

বটি দিয়ে খুনও করা যায় বলে তো আর দেশ থেকে বটি উঠিয়ে দেয়া যায় না, তাই না? এইডস প্রতিরোধ, জন্মনিয়ন্ত্রন ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে কিঞ্চিৎ হাসিঠাট্টা তো অনেকেই করেন। অনেক কৌতুকেরও জন্ম হয়েছে এর থেকে। তাই বলে কী এর আসল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়েছে?

মনে আছে বিটিভির সেই বিজ্ঞাপনের কথা? “আগে ছিলাম বোকা, এখন হইলাম বুদ্ধিমান”!
আমরা যদি এখন এই সামান্য বিষয় নিয়ে সংস্কার গেল সংস্কার গেল রব তুলি, তখন লোকে কী বলবে? বলবে- “শুরুতে ছিলো বোকা, তারপর হয়েছে বুদ্ধিমান… আর এখন হয়ে যাচ্ছে ভোাই”!

আসলে আমি তা, যা আমি বিশ্বাস করি। আমরা সবাই যদি বিশ্বাস করি যে এর থেকে ভালো কিছু সম্ভব, তাহলে অবশ্যই সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি-

সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান,
সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত করো ভয়,
আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।

আমার দেশের মায়েরা, মেয়েরা সুস্হ্য থাকুক।

[লেখাটি আমার সেই বন্ধুটিকে উৎসর্গ করছি যার জন্য এই প্রচারণা আর কোন নতুন অর্থ বহন করে আনবে না… ইতোমধ্যেই অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে… কেমো চলছে জানি, তবু ভালো থাকিস বন্ধু…]

পুনশ্চ:

গ্রহনযোগ্যতা একটা আপেক্ষিক বিষয় যা সময়ের সাথে নির্ধারিত হয়। অনেক আপাত: যন্ত্রণা যেমন সবাই মেনে নিয়ে রীতি বানিয়ে ফেলে, তেমনি আবার অনেক ভালো জিনিসও হারিয়ে যায় (যদিও ভালো মন্দ দুটোই এখানে আপেক্ষিক)।
দেখা যাক শেষ পর্যন্ত এটা কোথায় গিয়ে দাড়ায়।

তবে বোধহয় সবচে ভালো হতো যদি মেয়েরা এটা শুধু নিজেদের মধ্যেই রাখতে পারতো… ফেসবুক স্ট্যাটাস এর প্রচারে একটা “জেন্ডার বোতাম” রাখা উচিত যা দিয়ে শুধু নির্দিষ্ট জেন্ডারের বন্ধুদের কাছেই স্ট্যাটাস প্রকাশ করা যাবে।

Advertisements

Comments are closed.

%d bloggers like this: