সেই ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী [পর্ব ২]

সচলায়তনে প্রকাশিত

[পর্ব ১ এর পর]

দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা ও জাতিসংঘে ভেটো

প্রায় ৯০ থেকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানী বন্দীর ভরন-পোষণ এবং নিরাপত্তা বিধান ভারতের জন্যও একটি সমস্যা হয়ে ওঠে। ইতমধ্যে ভারতের বন্দি শিবিরগুলিতে একাধিকবার বিদ্রহের ঘটনা ঘটে। [১৫] পাকিস্তান একাধিকবার প্রচেষ্টা চালায় যেন ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক ভাবেই বন্দী মুক্তি সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বাধার কারনে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের যুক্তি ছিল যে, ঐসব পাকিস্তানী সৈন্য ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্নসমর্পণ করেছে এবং বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়া ভারত তাদের মুক্ত করতে পারে না। কিন্তু ভুট্ট দাবী করেন যে আটক সৈন্যরা মুলত: ভারতের বন্দী এবং যৌথ বাহিনীর কথা বলে আসলে পাকিস্তানের চোখে ধুলো দেয়া হচ্ছে। [১৬]

এই প্রক্ষিতে ১০ই আগস্ট ১৯৭২ এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্ট বলেন, “বাংলাদেশ ভেবেছে যে আমাদের বন্দীদের মুক্ত করার ব্যপারে তাদের ভেটো ক্ষমতা আছে”, কিন্তু “ভেটো আমাদের হাতেও একটি আছে”। [১৭]
পরবর্তীতে তিনি নিশ্চত করেন যে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ভাবেই চীনকে অনুরোধ করেছে যেন জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের আবেদনে চীন ভেটো দেয়। [১৮] সদ্যস্বাধীন একটি দেশের উন্নয়ন ও বৈদেশিক সহযোগিতা লাভে জাতিসংঘের সদস্যপদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আবেদন করে।
কিন্তু ২৫শে আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক বাংলাদেশের সদস্যপদের বিপক্ষে চীন নিরাপত্তা পরিষদে তার প্রথম ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে। [১৯] জাতিসংঘের মতন একটি আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশকে বঞ্চিত হতে হয় মুলত: একটি বর্বর গনহত্যার বিচার দাবী করার কারনে । কিন্তু এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে অটল থাকে।

বিচার ও প্রত্যাবাসন অচলাবস্থা
পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীসহ সকল বন্দীর মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে আটক উভয় দেশের কয়েক লক্ষ নিরাপরাধ নাগরিকদের প্রত্যাবাসনসহ দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য বিষয়েও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ইতমধ্যে বাংলাদেশ আরো ৪৫ জন পাকিস্তানী সৈন্যের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করায় অভিযুক্ত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা ১৯৫-এ উপনীত হয়। এসময় স্থানীয় ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করন ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ চলতে থাকে।

১৯৭২ সালের নভেম্বরে ভারত আটক পাকিস্তানী সৈন্যদের পরিবারের প্রায় ৬ হাজার সদস্যকে মুক্তি দিলে, পাকিস্তানও আটকে পড়া ১০ হাজার বাঙালী নারী ও শিশুর একটি দলকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়। [২০] কিন্তু পাকিস্তানে আটক অধিকাংশ বাঙালীর ভাগ্যই অনিশ্চিত থেকে যায়।

অবশেষে এ অচলাবস্থার অবসানের লক্ষ্যে ১৭ই এপ্রিল ১৯৭৩, টানা চার দিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর, বাংলাদেশ এবং ভারত একটি ‘যুগপৎ প্রত্যাবাসন’ প্রস্তাব দেয় পাকিস্তানকে। এই প্রস্তাব অনুসারে ভারত তার কাছে আটক প্রায় ৯০ হাজার বন্দী পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করবে, এবং বিনিময়ে পাকিস্তান তার কাছে আটক প্রায় দুই লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিককে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসিত করবে। এছাড়া, বাংলাদেশে আটক প্রায় ২৬০ হাজার অবাঙালী (বিহারী)-কেও পাকিস্তান ফেরত নিবে। [২১]

তবে এতকিছুর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে অটল থেকে বাংলাদেশ অভিযুক্ত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের এই প্রত্যাবাসন প্রস্তাবের বাইরে রাখে। [২২]

নিরাপরাধ বাঙালির বিচার
ভুট্ট যদিও ‘যুগপৎ প্রত্যাবাসন’ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন, কিন্তু তিনি মাত্র ৫০ হাজার বিহারীকে ফেরত নিতে সম্মত হন এবং বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী সৈন্যের বিচারের তীব্র প্রতিবাদ করেন। বাংলাদেশ যদি অভিযুক্ত পাকিস্তানীদের বিচার করে, তাহলে তিনি পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের একই রকম ট্রাইবুনালে বিচার করবেন বলে হুমকি দেন। ১৯৭৩ সালের ২৭শে মে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে ভুট্ট বলেন-

“(বাঙালীদের)এখানে বিচার করার দাবী জনগন করবে। আমরা জানি বাঙালীরা যুদ্ধের সময় তথ্য পাচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনিদির্ষ্ট অভিযোগ আনা হবে। কতজনের বিচার করা হবে, তা আমি বলতে পারছি না”। [২৩]

ভুট্ট দাবী করেন যে, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানীর সৈন্যদের বিচার করে, তাহলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ক্যু’র মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটাবে এবং দুই দেশের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রনের বাইরে নিয়ে যাবে। তিনি দাবী করেন, এই চক্রান্তের জন্য ইতমধ্যেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। [২৪]

ভুট্টর এ দাবী প্রত্যাখ্যান করে ১৯৭৩ সালের ৭ই জুন এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবর রহমান বলেন-

“মনবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ভোলা সম্ভব নয়, এই হত্যা, ধর্ষণ, লুটের কথা জানতে হবে। যুদ্ধ শেষের মাত্র তিন দিন আগে তারা আমার বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছে। তারা প্রায় ২ লক্ষ নারীকে নির্যাতন করেছে-এমনকি ১৩ বছরের মেয়েকেও। আমি এই বিচার প্রতিশোধের জন্য করছি না, আমি এটা করছি মানবতার জন্য”। [২৫]

তিনি পাকিস্তানে বাঙালীদের বিচারের হুমকির প্রতিবাদে বলেন, “এটা অবিশ্বাস্য… এই মানুষগুলো ডাক্তার, বিজ্ঞানী, সরকারী ও সামরিক কর্মকর্তা যারা বাংলাদেশে ফেরত আসতে চায়”।
তিনি প্রশ্ন করেন, “এরা কী অপরাধ করেছে? এটা ভুট্টর কী ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণতা?” [২৬]

কিন্তু ভুট্ট যে শুধু হুমকিই দিচ্ছেন না, তা প্রমাণের জন্য পাকিস্তান ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর ‘বদলি জিম্মি’ হিসেবে ২০৩ জন শীর্ষ বাঙালী কর্মকর্তাকে বিচারের জন্য গ্রেফতার করে। [২৭]

স্থানীয় ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু
এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় ও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া শুরু করে। স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুন্যাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২’ জারি করা হয়।
১৫ই জুলাই ১৯৭৩ বাংলাদেশ সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭(৩) ধারা সংযুক্ত করা হয় যেখানে “গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান” অর্ন্তভুক্ত করা হয়।[২৮]

এর মাত্র পাঁচ দিন পরই ২০ জুলাই ঘোষণা করা হয় ‘আর্ন্তজাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’ যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের জন্য স্থানীয় ও পাকিস্তানী উভয় ধরনের যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পথ সুগম হয়। [২৯]

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক ভাষণ [৩০], সংবিধানের ধারা [৩১] ও ট্রাইব্যুনাল আইনে [৩২] আর্ন্তজাতিক ন্যুরেমবার্গ ট্রাইবুনালের ৬(সি) ধারা [৩৩] অনুসরন করে যুদ্ধের সময় সাধারন জনগনের উপর পরিচালিত হত্যা-নির্যাতন বিষয়ক যুদ্ধাপরাধ বোঝাতে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কৌতুহলের বিষয় হলো, পচাঁত্তরের শেষ দিকে দালাল আইন বাতিলসহ অন্যান্য অনেক আইনি এবং সংবিধানিক পরিবর্তন আনা হলেও, কোন সরকারই এ পর্যন্ত সংবিধানের ৪৭(৩) ধারা অথবা ‘আর্ন্তজাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩’ বাতিল করেনি— যা ‘সহায়ক বাহিনীর সদস্য’ অর্থাৎ স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পথ উন্মুক্ত রেখেছে। [পর্ব ৩]

তথ্যসূত্র:

১৫. “4 Pakistani Prisoners Slain”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৯/০৬/১৯৭২, পৃ- ৩৯
১৬. “Bangladesh Will Try 1,100 Pakistanis”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ৩০/০৩/১৯৭২, পৃ- ৩
১৭. Transcript of President Bhutto’s Press Conference on Aug 10, 1972. উদ্ধৃত Burke, S.M. (1971). “The Postwar Diplomacy of the Indo-Pakistani War of 1971”, এশিয়ান সারভে, ভলিউম- ১৩, সংখ্যা ১১, (নভে ১৯৭৩)পৃ-১০৩৯
১৮. Weekly Commentary and Pakistan News Digest, ২৪/১১/১৯৭২. উদ্ধৃত Burke (১৯৭১), প্রাগুক্ত
১৯. “ A Veto By Peking” দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৭/০৮/১৯৭২, পৃ- ই৩
২০. “Pakistan to Allow 10,000 to Return to Bangladesh”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৩/১১/১৯৭২, পৃ- ১৫
২১. “India and Bangladesh Offer Plan For End of Deadlock on Prisoners”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৮/০৪/১৯৭৩, পৃ- ৯৭
২২. প্রাগুক্ত
২৩. “Bhutto Threatens to Try Bengalis Held in Pakistan”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৯/০৫/১৯৭৩, পৃ- ৩
২৪. প্রাগুক্ত
২৫. “Mujib Insists Pakistani P.O.W.’s Will Be Tried”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০৯/০৬/১৯৭৩, পৃ- ৯
২৬. প্রাগুক্ত
২৭. “India-Pakistan Talks Reach Impasse”, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬/০৮/১৯৭৩, পৃ- ৩
২৮. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ধারা ৪৭(৩), দেখুন-http://bdlaws.gov.bd/bangla_pdf_part.php?id=957
২৯. The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 (ACT NO. XIX OF 1973), ২০ জুলাই ১৯৭৩, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
৩০. “Mujib Insists Pakistani P.O.W.’s Will Be Tried”, প্রাগুক্ত
৩১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ধারা ৪৭(৩), প্রাগুক্ত
৩২. The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 , প্রাগুক্ত
৩৩. দেখুন http://avalon.law.yale.edu/imt/imtconst.asp#art6

Advertisements

Comments are closed.

%d bloggers like this: