গরিবের ঘোড়া রোগ

১. অপচয়ের আবার মূল্যহ্রাস!

প্রথম আলোর একটা খবরের শিরোনাম- ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী তিন কবির উদারতা। খবরের মূল কথা মোটামুটি এই-

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে তিন কবির জন্য বরাদ্দ ছিল বিমানে বিজনেস শ্রেণীর বিলাসবহুল আসন।… কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বিশেষ সুবিধা পেয়েও তা ফিরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ সাশ্রয়ের এক নজির দেখালেন তিন কবি। গত ১৪ আগস্ট তাঁদের তিনজনের প্রত্যেককে বিমান ভাড়া ও ১০ দিনের হাতখরচ হিসেবে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৭৬ টাকার চেক দেওয়া হয়। এক দিন পর তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে জানালেন, তাঁরা সাধারণ আসনে ভ্রমণ করে সাশ্রয়কৃত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেবেন। জানা গেছে, তাদের এই সিদ্ধান্তে সরকারের সব মিলিয়ে সাশ্রয় হবে প্রায় ১৩ লাখ টাকা ।

তিন কবির প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু আমার কঞ্জুস মন, ১৩ লাখ টাকার সাশ্রয়ের চেয়ে পুরো সফরের খরচ আমাকে বেশি ভাবায়। মূল্য হ্রাসে অদরকারী পণ্য কিনলে যেমন সঞ্চয় বৃদ্ধি হয়না, তেমনি অপ্রয়োজনীয় সফরের ব্যয় সংকোচনও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সাশ্রয় করে না।

২. গরিবের ঘোড়া রোগ

এই সফর একটা পুরোন খবর মনে করিয়ে দিল। চিকিৎসার জন্য বিমানের বিজনেস ক্লাসের টিকেটের টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় ক্রিকেট বোর্ডের উপর রেগেমেগে ভিসা ফরম ছিঁড়েই ফেলেছিলেন তামিম ইকবাল! সমস্যার যে সমাধার হয়েছে, এটাও পুরোন খবর

তানিম: “এ কথাটা আমাকে কেউ বলেনি। আমি তো জানতাম না মাশরাফি ভাই, সাকিবদের বিজনেস ক্লাসের টিকিট দেওয়া হয়েছে অধিনায়ক বলে। এ কারণেই আমি বলেছিলাম, ওনাদের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, আমাকেও তা-ই দিতে হবে।”

মাশরাফি: “অধিনায়ক হওয়ার আগে আমি যে পাঁচবার চিকিৎসার জন্য বাইরে গেছি, প্রতিবারই ইকোনমি ক্লাসে গেছি। তাতে ফেরার সময় আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কী করার আছে, নিয়ম তো মানতেই হবে।”

মাদাগাস্কার ছবির এই অংশটির কথা মনে আছে?

http://rutube.ru/tracks/1131736.html?v=a69946525ebf3870ee5a09d857aada9c

একেই বলে- গরিবের ঘোড়া রোগ!

৩. প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী বিরোধীদল ?!

প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক গিয়েছেন ১০৩ জন সফরসঙ্গী নিয়ে। কবে সেদিন আসবে, যেদিন প্রধানমন্ত্রী সফরসঙ্গীদের কে কোন দ্বায়িত্বে বিদেশ ভ্রমণ করেন তার লিখিত ব্যাখ্যা দেয়া হবে জনগনকে!

প্রথম আলোর হিসেব অনুযায়ী এই ১০৩ জন হলেন-

ব্যবসায়ী প্রতিনিধি                      ২৮ জন

প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য      ৬ জন

মন্ত্রী ও উপদেষ্টা                            ৭ জন

বিশেষ ব্যক্তিত্ব  (কবি)                   ৩ জন

বিশেষ ব্যক্তিত্ব  (দলীয় লোকজন)  ১১ জন

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়                     ১১ জন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়                          ৮ জন

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়                        ১ জন

এসএসএফ                                      ১৩ জন

গণমাধ্যম                                      ১৫ জন

——————————————-

মোট                                              ১০৩ জন

১০৩ জনের হিসাব তো মিললো। এবার দৈনিক সংবাদের এই হেডলাইন দেখুন– “প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে আমেরিকা যাচ্ছেন বিরোধীদলের এমপিরা”! সংবাদের দাবী, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপির জয়নুল আবদিন ফারুক ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি আমেরিকা যাচ্ছেন। আমার প্রশ্ন- তাদের বাদ দিয়েই ১০৩ জনের হিসাব মিলে কী করে? যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় এতলোক শামিল হচ্ছে, সেখানে শিরোনামটি কি একটি রেডহেরিং নয়?

৪.  উত্তম হয়না কেউ

“আজ এই নেত্রী করছেন, কিন্তু কাল ওই নেত্রীওতো করেছিলেন” ধরনের বিতর্ক নতুন না। প্রথম আলোর এই রিপোর্টটি তারই ধারাবাহিকতা হয়তো। আমজনতা কপালকুন্ডলা কপালপোড়া, কিন্তু আমাদের নেতা-নেত্রীরা নবকুমার নন, তাই তাদের মনে  “তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেনো?” ধরনের ভাবনা উদয় হয়না। কাজেই, এইসব রিপোর্ট অযথা।

কিন্তু এর বাইরেও একটা প্রচ্ছন্ন বক্তব্য/তুলনা আছে এই রিপোর্টটিতে, যেকারনে এর অবতারনা–

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সফরসংক্রান্ত সরকারি তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুই সরকারের আমলেই প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর তালিকা বড় হচ্ছে। দেশের প্রধান দুই দলের শাসনামলেই প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন রাষ্ট্রীয় সফরে সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। তবে এর পুরোপুরি ব্যতিক্রম ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ সময় সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি যেসব সফরে গেছেন, তাতে সংশ্লিষ্ট সফরের সঙ্গে যুক্ত লোকজনকেই সফরসঙ্গী করা হয়েছে। সে আমলে জোর দেওয়া হয়েছে খুব অল্পসংখ্যক লোককে সফরসঙ্গী করার বিষয়টিতে। এমনকি নিরাপত্তা দলের সদস্যসংখ্যাও সীমিত রাখা হয়েছে। অবশ্য ’৮২ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদের শাসনামলেও সফরসঙ্গীদের তালিকা ছিল দীর্ঘ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো সাবেক স্বৈরশাসকের আমলেও রাষ্ট্রীয় সফরগুলোতে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণীতে লোকজনকে সফরসঙ্গীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তত্বাবধায়ক আমলের তুলনাটি হয়তো নিতান্তই উদ্দেশ্যহীন। কিন্তু আমাদের অবস্থা অনেকটা ঘর পোড়া গরুর মতো, আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পেয়ে যাই।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: