একজন নাদির আলি এবং পাকিস্তানে কাউন্টার ন্যারেটিভ

[সচলায়তনে প্রকাশিত]

ঢাকায় ফিরেই যে নাদির আলির মুখোমুখি হবার সুযোগ হবে, তা কখোনই চিন্তা করিনি। পাকআর্মির অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল নাদির আলীকে নিয়ে আমার প্রাথমিক ভাবনা খুবই বিশৃঙ্খল ছিল। গত মাসেই আমি বিস্ময় নিয়ে কুখ্যাত খুনি ডেরেক পেরছি-র কাহিনী পড়ছিলাম। সিরিয়াল কীলার হয়েও কীভাবে একজন খুনি সাজা এড়াতে নিজেকে অপ্রকৃতিস্থ প্রমাণ করে, আর বিবেকের দংশন থেকে বাঁচার জন্য সত্যি সত্যিই জীবনের ভয়ংকর অপকর্মের স্মৃতি মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে , তা তার কাহিনী না পড়লে জানতাম না। ডেরেক-এর এই কাহিনী যখন পড়ছিলাম, ঠিক তখনই নাদির আলীর লেখাটা পেলাম । ভদ্রলোক একাত্তরে পাকআর্মির মেজর হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর লেখাতেই জানলাম, একাত্তরে পাকবাহিনীর বর্বরতা দেখে তিনি নিজেই অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যান। যুদ্ধের দ্বায়িত্ব থেকে সরিয়ে তখন তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। একাত্তরে বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সময়ের কিছু অংশের স্মৃতি তিনি তখন পুরোপুরিভাবে হারিয়ে ফেলেন।

পাকবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য হয়েও, একাত্তরে পাকবাহিনীর নৃশংসতা তুলে ধরার জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ হই। কিন্তু তিনি যখন বলেন, “আমার স্মৃতিভ্রম হয়েছে, কিন্তু আমি জানি যে আমি নিজে কোন খুন করিনি”, তখন বিভ্রান্ত হই। বিবেকের দংশন থেকে মুক্তির জন্য নিজের অপকর্মের স্মৃতি ভুলে যাবার যে ঘটনা আমি ডেরেক পেরছির জীবনীতে পড়ছিলাম, তা আমাকে বিভ্রান্ত করে।

গত ১৬ এবং ১৭ই মার্চে বিডিআই আর ‘১৯৭১ কালেক্টিভ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিন ব্যপী এক ওয়ার্কশপে তাঁর সাথে দেখা। ওয়ার্কশপের প্রথম দিন প্রথম বারের মতো মেহেরজান ছবিটি দেখার ও তা নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ হয়েছিল, তাও আবার ছবির পরিচালক, কুশিলব আর চিত্রসমালোচকদের সাথে (সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আরেক দিন লিখবো)।

ওয়ার্কশপের দ্বিতীয় দিন ছিল নাদির আলির স্মৃতিচারণ। ভদ্রলোকের মাথা ভর্তি সাদা চুল, মুখে বার্ধক্যের ছাপ। যখন তিনি একাত্তরের স্মৃতিচারণ শুরু করলেন, ছোট্ট কনফারেন্স রুমে নেমে এলো পিনপতন নিরবতা। কাঁপা কাঁপা হাতে নোটগুলো থেকে তিনি একটানা বলে চললেন তাঁর একাত্তরের স্মৃতি। কিছু ঘটনা আগে জানতাম তার লেখা সুবাদে, অনেক কিছুই জানলাম নতুন করে। একাত্তরে নিজের ভুমিকা নিয়ে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন এভাবে-
“একাত্তরে আমি নিজে কোন খুন করিনি। তবে এটা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে যথেষ্ট নয়। এটা শুধু নিজের আদালতে নিজের বিচার—যেখানে আমিই আসামী, আমিই বিচারক। কিন্তু আমার পারিবারিক আবহ এবং আমার বেড়ে ওঠা আমাকে এধরনের বর্বরতা হতে বিরত রাখার কথা। হয়তো সে কারনেই আমি এর প্রতিবাদ করেছিলাম। তবে নিজে খুন করেছি কি করিনি, এটা কোন আত্নপক্ষ সমর্থন হতে পারে না। আর্মিতে আমি অভিন্ন পোষাকই পড়তাম, একই বাহিনীর সদস্য ছিলাম। তাই আমিও পাকবাহিনীর সেই নৃশংসতার সমান অংশীদার”।

যুদ্ধের পর বেশ কয়েক বছর লাগে তার সুস্থ হতে। পুরোনো সহকর্মীদের সাথে আবার যোগাযোগ শুরু হয়। তারাই তাকে জানায়, নির্বিচার হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানাতে কিভাবে একদিন তিনি পাকবাহিনীর পোষাক ত্যাগ করে ধুতি পড়ে বাহিনীতে হাজির হয়েছিলেন। এরপরই তাকে অপ্রকৃতিস্থ হিসেবে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়।

নাদির আলির দীর্ঘ বর্ণনার কিছু অংশ পাঠকের জন্য অনুবাদ করছি, তার নিজের জবানীতে—

“সত্তরের নির্বাচন অনেকটা নিরপেক্ষ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের ভুল ধারনার কারনে। আইএসআই-র সংগৃহীত তথ্য থেকে ইয়াহিয়ার ধারনা হয় যে তিনিই সংখ্যাগরিষ্টতা পাবেন। কাজেই, নির্বাচনে পরাজয় তাদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। এরপরও, মার্চে যখন সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রহ দানা বাধতে থাকে, তখন পশ্চিমাদের ধারনা ছিল, এ আন্দোলন শুধু ঢাকা কেন্দ্রীক—কঠোর হস্তে দমন করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

“এরপরই তো শুরু হয় যুদ্ধ। আমি তখন মেজর হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি। এপ্রিলের মাঝামাঝি আমাকে পাঠানো হয় শেখ মুজিবরের দেশের বাড়ি। আদেশ দেয়া হয়, ‘এটা মুজিবের নিজের জেলা, যত বেজন্মা পারো হত্যা করো… আর নিশ্চিত করবে কোন হিন্দুই যেন জীবিত না থাকে’।”

হঠাৎ করেই শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন রাজাকারদের ভুমিকা জানতে চান তার কাছে। কথায় বাধা পেয়ে তিনি সম্ভবত একটু বিরক্ত হন। বলেন, “এই কাহিনীতেই তা জানতে পারবেন”। বলেই তিনি তার মূল বর্ণনায় চলে যান।

“আমি তখন অগ্রবর্তী দল নিয়ে ফরিদপুর চলে যাই। সেখানে একটি ফায়ার বেস তৈরি করে সবদিকে গুলি করতে থাকি। সৌভাগ্যক্রমে আশে পাশে কেউ ছিল না। কিন্তু হঠাৎই কিছু বেসামরিক লোককে দেখি আমাদের দিকে আসছে। আমি সৈন্যদের গোলাগুলি বন্ধ করতে বলি। লোকগুলো কাছে এসে জানায়, তারা ওই গ্রামের লোক এবং তারা এসেছে আমাদের জন্য পানি নিয়ে। আমি সৈন্যদের চা বিরতি দিয়ে বেশ কিছু সময় সেখানে অবস্থান করি।
“এমন সময় মূল বাহিনী পৌছে যায় আমাদের কাছে। এক কণের্ল আমার কাছে এসে জানতে চান, ‘স্কোর কত?” আমি বললাম, ‘এখানে কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হইনি, তাই আমাদের কাউকে হত্যা করতে হয়নি’। কর্ণেল তখন তার হাতের মেশিনগানটি আমাদের জন্য পানি নিয়ে আসা গ্রামের লোকগুলোর দিকে তাক করে গুলি চালানো শুরু করলেন। চোখের সামনেই লোকগুলো মারা গেল। কর্ণেল তখন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দ্যাট ইজ দ্যা ওয়ে, মাইবয়’!”

এরপর ঘুরে তাকান প্রশ্নকর্তার দিকে– “আপনি কোলাবরেটরদের কথা জানতে চাচ্ছিলেন না? এই হলো তাদের পরিণতি”।

প্রশ্নোত্তর পর্বে কেউ একজন জানতে চাইলেন, হত্যাযজ্ঞের ব্যাপকতা নিয়ে। তিনি বললেন—

“কিছুটা অতিরঞ্জন আসলে সব মহলেই হয়েছে। বাঙালি কর্তৃক বিহারীদের হত্যার যে হিসাব পাকিস্তান দেয়, তাও তো অতিরঞ্জিত। যুদ্ধের সময়েই আমি খবর পেলাম চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় ব্যপক বিহারী নিধন হয়েছে। আমি তখন সেখানেই ছিলাম। আমি ঘুরে ঘুরে সেই এলাকা দেখেছি তখন, অনেকের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু সেই হত্যাকান্ডের কোন নজির পাইনি। আবার, কিছুদিন আগেও তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক সদস্যের সাথে কথা হলো। হত্যাকান্ডের ব্যাপকতা নিয়ে বাংলাদেশের দাবি কতোটা অতিরঞ্জিত, তা নিয়েই যখন কথা হচ্ছিল, তখন সে অনেকটা গর্বের সাথেই বললো- ‘কিন্তু স্যার, আমি নিজেইতো অনেক বাঙালি মেরেছি’!”

নাদির আলি প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন। নিষ্ঠুর সব হত্যাকান্ডের কথা বলতে থাকেন একে একে, যা তাকে এক সময় পুরোপুরি অসুস্থ করে ফেলে।

নাদির আলির কথা শুনে মনে হলো, পাকিস্তানে সম্ভবত একাত্তর নিয়ে তৈরি হওয়া সরকারী আবরণ ভেঙে পড়ছে—শুধু হামীদ মীর -ই নয়, অনেকেই একাত্তরে পাকিস্তানের ভুমিকা নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। একাত্তরে পাকিস্তানি সুশীল সমাজের নিরবতাকে সমালোচনা করে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ জাফর আহমেদও একটি প্রবন্ধ পাঠ করলেন। পাকিস্তানের কোন বুদ্ধিজীবি কখন কী লিখেছেন তার বেশ দীর্ঘ একটি রিভিউ দিলেন। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কামরান আসদর আলীও একাত্তর নিয়ে পাকিস্তানি কম্যুনিস্ট দলগুলোর ভুমিকার সমালোচনা করে একটি প্রবন্ধ পাঠ করলেন।

শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, হামীদ মীরেরা দীর্ঘ দিনের নীরবতা ভঙ্গ করে একাত্তর নিয়ে সরব হচ্ছেন। বাংলাদেশে যখন একাত্তর নিয়ে ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ বিতর্ক চলছে, পাকিস্তানে কি তখন সরকার-প্রতিষ্ঠিত মেটা-ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে নীরবে শুরু হয়েছে আরেক ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’?

একাত্তরে পাকবাহিনীর বর্বরতার খুব অল্পই হয়তো আমি জেনেছি। ওই অতটুকুই আমার মধ্যে যুক্তিহীন কিছু বিষয়ের জন্ম দিয়েছে–আমি পাকিস্তানি পণ্য কিনি না, খেলায় পাকিস্তানকে সমর্থন করিনা (এমনকি ‘খেলা আর রাজনীতি ভিন্ন’ ধরনের আলোচনাকেও অসহ্য লাগে)।

আমার সন্দেহবাতিক মন তাই প্রশ্ন করে, ‘পাকিস্তানের দোসর বলে আমরা কী এইসব নাদির আলিদের প্রত্যাখ্যান করবো; না-কি তাদের রাজসাক্ষী করে আর্ন্তজাতিক আসরে শর্মীলা বোসদের মিথ্যাচারের জবাব দেব?’ আমি উত্তর খুঁজি না। কারন আমি জানি, দেশের মানুষই জানে কোনটা ঠিক পথ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: