একাত্তরে বিহারি নির্যাতন

[সচলায়তনে প্রকাশিত]

একাত্তরে বাঙালির উপর পাকিস্তানিদের গণহত্যা নিয়ে যতটুকু কাজ হয়েছে, বিহারীদের প্রতি বাঙালিদের নির্যাতন নিয়ে কাজ হয়েছে তারচে’ কম। যুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে যেমন বিস্তর গবেষণা হয়, যুদ্ধের পর বিজিতের উপর বিজয়ীর অত্যাচার নিয়েও তেমনি অনেক অনুসন্ধানী রিপোর্ট হয়ে থাকে। বিজিতের উপর বিজয়ীর অত্যাচার ভয়ংকর হতে পারে। এমনকি ধর্মের নামেও ইতিহাসে যেসব যুদ্ধ হয়েছে, সেখানেও বিজিতের স্ত্রী-কন্যাদের গনিমতের মাল হিসেবে অধিগ্রহণ করে দাসী বা যৌনদাসী বানিয়ে রাখার প্রচলন ছিল। ফরাসী বিপ্লবের পর গণহারে ‘বিপ্লবের শত্রুদের’ হত্যাকান্ডের বিভৎস বিবরণ ইতিহাসেরই অংশ।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে একাত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যদের চালিত গণহত্যা এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বিজয়ী বাঙালিদের হাতে বিহারিদের অবস্থা—উভয় নিয়েই লেখালেখির পরিমান অনেক কম। হাটে-মাঠে-ঘাটে পড়ে থাকা লক্ষ লাশের ছবিগুলো যেমন পাকিস্তানিদের চালানো গণহত্যার নিরব সাক্ষী হয়ে আছে; তেমনি, যুদ্ধের পর কাদের সিদ্দিকীর ‘বিচার কর্মের’ ছবিটিও ভিক্টরস জাস্টিস হিসেবে সারা বিশ্বে প্রচার পেয়েছে।

সভ্যতা আর মানবিকতার বিচারে হত্যাকান্ড—হত্যাকান্ডই, তা সে একটিই হোক আর লক্ষটিই হোক। কোন পরিবারই যেন এ ধরনের বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ডের স্বীকার না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরী। ঠিক একারনেই পাকিস্তানি ও তাদের এদেশিয় বাঙালি-বিহারি দোসরদের হাতে লক্ষ লক্ষ বাঙালির গণহত্যার তদন্তের পাশিপাশি, অতি উৎসাহী যেসব বাঙালির হাতে বিহারিরা নির্মম পরিণতির স্বীকার হয়েছিলো, তারও তদন্ত প্রয়োজন। এই অতীত কর্মকান্ডের মূল্যায়ন ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি ঘটাকে বিরত রাখবে।

তবে, এক বা একাধিক মানুষ খুন হলে তা হয় ‘হত্যাকান্ড’, হাজার মানুষ খুন হলে তা হয় ‘গণহত্যা’, আর লক্ষাধিক খুন হলে তা হয় ‘পরিসংখ্যান’। ফলে, তুলনামূলকভাবে ‘হত্যাকান্ড’ সবসময়ই গণহত্যার চেয়ে বেশি আপীল তৈরি করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের গণহত্যা কেবল একটি পরিসংখ্যানই থেকে যায়। পাকিস্তানিদের গণহত্যা যেহেতু বাঙালিদের প্রতিশোধমূলক হত্যাকান্ডের সাথে তুলনীয়ই নয়, সে কারনে অনেকেই বিহারি নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আনাকে ভুল পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারো কারো মতে, আমরা যদি বিহারি নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করি, তাহলে শর্মিলা বসুরা এটিকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে নতুন প্রপাগান্ডা তৈরি করবে। তবে আমার কাছে বরং বিষয়টি উল্টো মনে হয়— মাত্রা ও বিভিষিকার দিক থেকে বিহারিদের প্রতি নির্যাতন যদি পাকিস্তানিদের গণহত্যার সমকক্ষ না-ই হয়, সেক্ষেত্রে উভয় অন্যায়ের তদন্ত বরং ন্যায়বিচার ও সত্যানুসন্ধানে ইতিবাচক হবে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দীকা একটি ইমেইলের মাধ্যমে শর্মিলা বোসের কল্পকর্মের সমালোচনায় বলেছেন— “আক্রমনকারীর ভায়োলেন্স আর আক্রান্তের ভায়োলেন্স ভিন্ন করে দেখা প্রয়োজন, কারন আক্রমনকারী যদি শুরুতে আক্রমন না করতো, তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তিও হয়তো একই ভাবে সাড়া দিত না”। তবে, যে যেই কারণেই করে থাকুক না কেন, যুদ্ধের সুযোগে যারা হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের কর্মকান্ড কোন ভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়। আমাদের ইতিহাসের এই অস্বস্তিকর অংশটুকু আমাদের সততার সাথেই মোকাবেলা করতে হবে।

আবার এটাও ঠিক, দেশের কতিপয় পত্রিকার “ভারসাম্যনীতি”-র ন্যায়, পাকিস্তানিদের হাতে বাঙালিদের গণহত্যাকে যুদ্ধ পরবর্তী বিহারি নির্যাতনের সাথে এক কাতারে ফেললে সত্যা বা ন্যায়বিচার কোনটিই প্রতিষ্ঠিত হবে না।

এই প্রেক্ষিতেই ব্রিটেনের ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সনের একটি লেখা এখানে শেয়ার করছি। যুদ্ধের অব্যবহিত পরই পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ভারতের বিভিন্ন শিবিরে পাঠিয়ে দেবার কথা আমরা জানি, যা পরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচারের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছিল। আর দি গার্ডিয়ানের এই লেখাটিতে জানা যায়, যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনী বা তৎকালীন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অর্ধেকেরও বেশি শক্তি নিয়োজিত ছিল বিহারিদের নিরাপত্তার জন্য। কাউন্টার ন্যারেটিভ লিখতে গিয়ে আমরা যেন এগুলো ভুলে না যাই—

দি গার্ডিয়ান, ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, পৃষ্ঠা ৪
বিহারি অপারেশনে পাঁচ ব্যাটেলিয়ন
ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি

বিগত দুই সপ্তাহ ধরে বিহারি জনগোষ্ঠির পাহারা ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ আর্মির অর্ধেকেরও বেশি লোকবল নিয়োজিত আছে বলে জনৈক আর্মি অফিসার আজ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের—যা কিনা বাংলাদেশের একমাত্র নিয়মিত বাহিনী- পাঁচ ব্যাটেলিয়ন সৈন্য রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকায় ঘেরাও ও তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। গত মাসে মিরপুর এলাকায় সংঘর্ষে ৪৬ জন বিহারি ও ৩৫০ জন বাঙালির মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল।
উল্লেখ্য, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাত্র নয়টি ব্যাটেলিয়ন সক্রিয় রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসারটি জানান, “আমরা যদি আজ রাতেই এই এলাকা ত্যাগ করি, তাহলে বাঙালিরা এসে বিহারীদেরকে মেরে ফেলবে”।
অনেক বিহারীই, যারা মুসলিম, গত বছর এখানে পাকিস্তানি সৈন্যদের সহোযোগি হিসেবে কাজ করেছিল।

ডিসেম্বরে পাকিস্তান আর্মির পতনের পর আজ প্রথমবারের মতন সাংবাদিকদের এই কলোনী পরিদর্শনের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়া হয়। তবে পরিদর্শনে সাম্প্রতিক প্রতিশোধ বা খাদ্যাভাবের কোন চিহ্ন দেয়া যায়নি।
বিহারিরা বলেছে, তাদের খাওয়ানো হচ্ছে, যদিও কিছুটা অনিয়মিত ভাবে। সেখানে গম নিয়ে রেডক্রসের ট্রাক ঢুকতে দেখা যায়। সরকারি রেশন দেয়া দোকানগুলোতেও অনেককে লাইন দিতে দেখা যাচ্ছিল।

তখনও (মিরপুর) ১২ নম্বর সেকশনে অস্ত্র তল্লাশির অভিযান চলছিল। কয়েক হাজার বাহারি পুরুষকে একটি মাঠে তল্লাশি শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
সম্ভাব্য লুটের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মহিলাদেরকে তাদের মুল্যবান জিনিসপত্র আকঁড়ে ধরে বাড়ি-ঘরের কাছাকাছিই আরেকটি মাঠে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তারা স্বীকার করেন যে তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয়নি, তবে কিছু পুরুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
একজন আর্মি অফিসার জানান যে, গতকাল ১২ নম্বর সেকশন থেকে (শত্রু বাহিনির) সহযোগি ও অপরাধি সন্দেহে ৪৮০ জন পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন বিহারি অবশ্য গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা গুনে রেখেছে উল্লেখ করে সংখ্যাটি ১৫৫৬ বলে দাবি করে।

এক-রুমের বাড়িগুলোর ভেতরে কিছু এলোমেলো ও রাফ তল্লাশির চিহ্ন দেখা যায়, কিন্তু খুব কমই ধ্বংশযজ্ঞের চিহ্ন পাওয়া যায়।
অস্ত্রের তল্লাশি অভিযান আরো কয়েকদিন চলার কথা রয়েছে। এক সপ্তাহ আগে জোর পূর্বক উচ্ছেদের স্বীকার হওয়া প্রায় দশ হাজার বিহারিকে ফেরত আনার পরিকল্পনা তাই আপাতত: স্থগিত করা হয়েছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: